বাংলাদেশে মোটরসাইকেল চালানো কি আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে? প্রতিদিন যাঁরা বাইকে অফিসে যান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেন কিংবা রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারির মাধ্যমে আয় করেন, তাঁদের কাছে প্রশ্নটি এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম, নিয়মিত সার্ভিসিং, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কাগজপত্রের খরচের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের সামনে নতুন নম্বরপ্লেট লাগানোর নির্দেশনা নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে বাইক কেনা ও চালানোর আগে শুধু ক্রয়মূল্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের হিসাব করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
মোটরসাইকেল বাংলাদেশের অনেক মানুষের জন্য সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের মাধ্যম। গণপরিবহনের অপেক্ষা এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে কর্মস্থলে যাতায়াতও সহজ হয়। কিন্তু একটি মোটরসাইকেল কিনে ফেললেই খরচ শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত জ্বালানি কেনা, ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন, ব্রেক ও টায়ারের যত্ন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বদলানো এবং সরকারি কাগজপত্র ঠিক রাখার জন্যও টাকা ব্যয় করতে হয়। এসব খরচের সঙ্গে নতুন কোনো নির্দেশনা মেনে চলার ব্যয় যোগ হলে মোটরসাইকেল মালিকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বাইক চালানোর খরচে জ্বালানি অন্যতম বড় বিষয়। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা নির্ধারিত ছিল। সেপ্টেম্বর মাসে দাম বাড়ানোর পর অক্টোবরেও এই মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়। ফলে যাঁরা প্রতিদিন দীর্ঘ পথ মোটরসাইকেল চালান, তাঁদের মাসিক জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হতে পারে। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং চালক ও ডেলিভারিকর্মীদের জন্য জ্বালানি খরচ সরাসরি দৈনিক আয়ের হিসাবকে প্রভাবিত করে। তবে প্রত্যেক বাইকারের খরচ এক নয়; মোটরসাইকেলের মাইলেজ, দৈনিক চলার দূরত্ব, যানজট এবং চালানোর ধরনের ওপর ব্যয় নির্ভর করে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি মোটরসাইকেল যদি প্রতি লিটার অকটেনে ৪০ কিলোমিটার চলে এবং চালক প্রতিদিন গড়ে ৩০ কিলোমিটার যাতায়াত করেন, তাহলে ২৬ দিনে মোট দূরত্ব হবে ৭৮০ কিলোমিটার। এই হিসাবে মাসে প্রায় ১৯ দশমিক ৫ লিটার অকটেন লাগবে। প্রতি লিটার ১৬৫ টাকা ধরলে জ্বালানি খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ২১৭ টাকা ৫০ পয়সা। এটি কেবল একটি উদাহরণ; বাস্তবে যানজট, রাস্তার অবস্থা, মোটরসাইকেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও চালানোর ধরন অনুযায়ী মাইলেজ কমবেশি হতে পারে। ইঞ্জিন অয়েল, সার্ভিসিং ও অন্যান্য খরচ এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়।
জ্বালানির পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও মোটরসাইকেল চালানোর ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্দিষ্ট সময় পরপর ইঞ্জিন অয়েল বদলানো, ব্রেক পরীক্ষা, চেইন পরিষ্কার ও লুব্রিকেশন, টায়ারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করতে হয়। এসব কাজ অবহেলা করলে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে, অন্যদিকে পরে বড় ধরনের মেরামতের জন্য বেশি টাকা ব্যয় করতে হতে পারে। তাই খরচ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ বাদ দেওয়ার বদলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী যত্ন নেওয়াই ভালো।
এদিকে মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট লাগানো নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ১৫ নভেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সামনে নির্ধারিত নিয়মে নম্বরপ্লেট লাগানোর নির্দেশনা দিয়েছে। প্লেটের উপাদান, রং, অক্ষর ও মাপের বিষয়ে নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। পেছনের নিবন্ধন নম্বরপ্লেটের পাশাপাশি সামনে নম্বর প্রদর্শনের এই নির্দেশনা মানতে মালিকদের নিজ উদ্যোগে প্লেট তৈরি ও স্থাপন করতে হবে। ফলে বাইকারদের জন্য এটি অতিরিক্ত একটি খরচ হতে পারে। তবে কত টাকা লাগবে, তা প্লেট তৈরির উপাদান, দোকান ও স্থাপনের খরচের ওপর নির্ভর করবে; সরকারি নির্দেশনায় নির্দিষ্ট বাজারমূল্য ঘোষণা করা হয়নি।
ট্রাফিক আইন প্রয়োগে এআই ক্যামেরার ব্যবহার নিয়েও চালকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার উদ্যোগ সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সহায়তা করতে পারে। তবে চালকদেরও ট্রাফিক সিগন্যাল, গতিসীমা, হেলমেট ব্যবহার, বৈধ লাইসেন্স এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নিয়ম মেনে চলতে হবে। আইন ভাঙলে পরিস্থিতি অনুযায়ী জরিমানা বা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা হতে পারে। তাই মোটরসাইকেল চালানোর প্রকৃত খরচ হিসাব করার সময় শুধু নিয়ম মানার জন্য ব্যয় নয়, নিয়ম অমান্য করলে সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা উচিত।
মোটরসাইকেলের ওপর নতুন কর আরোপের প্রস্তাব নিয়েও কয়েক মাস আগে বিতর্ক হয়েছিল। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের ক্ষমতা অনুযায়ী অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব আলোচনায় আসে। তবে পরে সরকার ওই প্রস্তাব থেকে সরে আসে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাই প্রস্তাবিত অঙ্কগুলোকে বর্তমানে সব মোটরসাইকেল মালিকের জন্য কার্যকর নতুন বার্ষিক কর হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে নিবন্ধন, প্রযোজ্য সরকারি ফি এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কর-সংক্রান্ত কাগজপত্রের বাধ্যবাধকতা আলাদা বিষয়। নিজের মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম প্রযোজ্য, তা বিআরটিএ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা থেকে যাচাই করা উচিত।
তাহলে মোটরসাইকেল চালানো কি এখন ব্যয়বহুল? এর উত্তর নির্ভর করে ব্যক্তির ব্যবহার ও খরচের ধরন অনুযায়ী। যাঁরা প্রতিদিন দীর্ঘ পথ চলেন, তাঁদের জ্বালানি ব্যয় বেশি হবে। যাঁদের পুরোনো মোটরসাইকেলে ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন হয়, তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, অল্প দূরত্বে যাতায়াতকারী একজন ব্যবহারকারীর মাসিক ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে। মোটরসাইকেল ব্যবহারে সময় সাশ্রয়, গণপরিবহনের খরচ এবং কাজের সুবিধাও হিসাবের মধ্যে রাখা দরকার। শুধু একটি খরচ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সব ব্যয় ও সুবিধা একসঙ্গে তুলনা করাই যুক্তিযুক্ত।
খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাইকাররা কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেন। প্রয়োজন ছাড়া অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ পথ এড়িয়ে চলা, টায়ারের বাতাস ঠিক রাখা, নিয়মিত সার্ভিসিং করা, ইঞ্জিনের উপযোগী জ্বালানি ব্যবহার করা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চললে কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স, নিবন্ধন ও প্রযোজ্য কাগজপত্রের মেয়াদ আগে থেকে যাচাই করে রাখলে শেষ মুহূর্তের ঝামেলা কমবে। নতুন কোনো নিয়মের খবর দেখলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের বদলে সরকারি ঘোষণা যাচাই করা উচিত।
সব মিলিয়ে, মোটরসাইকেল চালানোর খরচ নির্ধারণে শুধু জ্বালানির দাম নয়, রক্ষণাবেক্ষণ, কাগজপত্র এবং নিয়ম মেনে চলার ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নম্বরপ্লেটের নির্দেশনা বাইকারদের জন্য বাড়তি খরচ তৈরি করতে পারে, কিন্তু মোটরসাইকেলের ওপর নতুন অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহারের খবরও মনে রাখা প্রয়োজন। তাই বাইক বিক্রি করবেন কি না, তা নির্ধারণের আগে নিজের মাসিক ব্যয়, যাতায়াতের প্রয়োজন এবং বিকল্প ব্যবস্থার খরচ হিসাব করুন। নিয়ম মেনে নিরাপদে মোটরসাইকেল চালানো এবং সরকারি তথ্য যাচাই করাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।